বিবরণ |
ভূমিকাঃ আমার বাবা তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে লেখা এটি আমার তৃতীয় বই। তাঁকে নিয়ে রচিত প্রথম বই, “তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা” তে বিভিন্ন তথ্য, দলিল, গবেষণা, সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণার আলােকে তুলে ধরা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের অনন্য পরিচালক এক রাষ্ট্রনায়কের অসাধারণ জীবন ও কর্মকে। দ্বিতীয় বই, ৩ নভেম্বর জেল হত্যার পূর্বাপর” রচিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানের ঢাকা। কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মম হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। বর্তমান বইটিতে যুক্ত হয়েছে বাবাকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে লেখা রচনা। তাঁর অমর্ত্যলােকে যাত্রার পর, মৃত্যু এবং পরকাল নিয়ে আমার চিন্তা ও অনুসন্ধান থেকে সৃষ্ট হয়েছে “আলাের পথের যাত্রী” এই প্রবন্ধটি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পুনঃজন্ম দানকারী, এই দলটির চরম দুঃসময়ের নেত্রী ও আহ্বায়িকা আমার মা সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের কিছু লেখা এবং তাঁর সম্পর্কে আমার রচনা ও সমসাময়িক প্রবন্ধ প্রাসঙ্গিকভাবেই উল্লেখিত হয়েছে। বইটি যাকে উৎসর্গ করেছি, সেই প্রিয় বােন আনার আপা সম্পর্কে প্রবন্ধে তাঁর শৈশব-কৈশাের জীবনে দিক নির্দেশনাকারী, তাঁর প্রিয় বড়মামা, তাজউদ্দীন আহমদ মূর্ত হয়েছেন। বাবাকে নিয়ে প্রথম বইটি প্রকাশের পর যিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন এবং ক্যানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে ঐ বই-এর আলােচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রেখে আমাকে সম্মানিত করেছিলেন, সেই প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব, ডঃ মীজান রহমান আমাকে অনুরােধ করেছিলেন, তাঁর প্রিয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে লেখা তাঁর প্রবন্ধটি যেন এই বইতে অন্তর্ভুক্ত করি। অন্যান্য স্বনামধন্যদের রচনার সাথে পরিশিষ্টে তাঁর লেখাটি যুক্ত হলাে। কিন্তু তিনি দেখে যেতে পারলেন না, এই কষ্ট থেকেই গেল। বহুল আলােচিত তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা বইটি সম্পর্কে গুণীজনদের মন্তব্যও পরিশিষ্টে যােগ হলাে। মনীষীরা বলেন ইতিহাসে কোনাে ফাক রাখতে নেই। ফাক থাকলেই তাতে ঢুকে পরে। জঞ্জাল ও বিভ্রান্তি। ঢুকে পরে স্বাধীনতার বিপরীত আদর্শের মানুষরা আর ওৎ পেতে থাকা সুযােগ সন্ধানীরা। যারা সততা, মেধা ও আত্মত্যাগের মশাল জ্বালিয়ে জাতির ইতিহাস নির্মাণ। করেছেন, তাদের যখন মূল্যায়ন হয় না, তখনি যার যেখানে স্থান নেই, সে হাতহাসের সেই (খলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলটা হয় মারাত্মক। সমাজে বিভেদ, বিভ্রান্তি ও হাহানতা বৃদ্ধি পায়। জাতির ভিত্তি হয়ে পড়ে নড়বড়ে। মনে রাখা প্রয়ােজন যে সমাজের দিক নির্দেশক, ইতিহাস নির্মাণকারী এব সমান। বহু নক্ষত্রের সমারােহেই ইতিহাসে নিতে পারে সঠিক পথের ঠিকানা। হাত মূল্যায়ন তাই জাতি গঠনের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। শক, ইতিহাস নির্মাণকারী এক একজন মানুষ, ইতিহাসের এক একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র ফএের সমারােহেই ইতিহাসের আকাশটি আলােকিত হতে পারে। জাতি খুঁজে পথের ঠিকানা। ইতিহাসের স্বচ্ছতা ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের আন্তরিক মূল্যায়ন তাই জাতি গঠনের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাজউদ্দীন আহমদ এবং বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যদয়। অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তিনি আমাদের ইতিহাসের এক সর্বশ্রেষ্ঠ সময়, মহান মুক্তিযুদ্ধের অনন্য নেতা ও রাষ্ট্র নায়ক। খাটি নেতা তিনিই যিনি অন্যের বেদনার ভার নিজ কাঁধে বহন করেন এবং মুক্তির পিচ্ছিল পথটির পথ নির্দেশক হন প্রজ্ঞা, সাহস, সততা ও দক্ষতার আলাে ছড়িয়ে। রাষ্ট্র নায়ক ভাবেন শত বছর পরের কথা। সেই অনুযায়ী তিনি সমুখে চলার পথের মানচিত্র নির্মাণ করেন; জনকল্যাণভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়েন জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়েই। নেতা ও রাষ্ট্রনায়কের বিরল গুণে ভূষিত তাজউদ্দীন আহমদকে তাই ভালমত না জানলে, প্রাথমিক হতে উচ্চ শিক্ষার সর্বস্তরে এবং জাতীয় পর্যায়ে তার জীবন-কর্ম ও অবদানকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে না ধরলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। প্রথম বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠার দিন ১০ এপ্রিলের বেতার ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, “আমাদের এই পবিত্র দায়িত্ব পালনে এক মুহূর্তের জন্যেও ভুলে গেলে চলবে না যে এ যুদ্ধ গণযুদ্ধ এবং সত্যিকার অর্থে একথাই বলতে হয় যে এ যুদ্ধ বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের যুদ্ধ। খেটে খাওয়া সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, ছাত্র-জনতা তাদের সাহস, তাদের দেশপ্রেম, তাদের বিশ্বাস, স্বাধীন বাংলাদেশের চিন্তায় তাদের নিমগ্ন প্রাণ, তাদের আত্মাহুতি, তাদের ত্যাগ ও তিতিক্ষায় জন্ম নিল স্বাধীন বাংলাদেশ। সাড়ে সাত কোটি মানুষের সম্মিলত প্রচেষ্টায় ফলপ্রসূ হয়ে উক আমাদের স্বাধীনতার সম্পদ। বাংলাদেশের নিরন্ন দুঃখী মানুষের জন্যে রচিত হােক এক নতুন পৃথিবী, যেখানে মানুষ মানুষকে শােষণ করবেনা। আমাদের প্রতিজ্ঞা হােক ক্ষুধা, রােগ, বেকারত্ব ও অজ্ঞানতার অভিশাপ থেকে মুক্তি। এই পবিত্র দায়িত্বে নিয়ােজিত হােক সাড়ে সাত কোটি বীর বাঙালি ভাইবােনের সম্মিলিত মনােবল ও অসীম শক্তি। যারা আজ রক্ত দিয়ে উর্বর করছে বাংলাদেশের মাটি, যেখানে উৎকর্ষিত হচ্ছে স্বাধান বাংলাদেশের নতুন মানুষ, তাদের রক্ত আর ঘামে ভেজা মাটি থেকে গড়ে উঠুক নতুন গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা; গণমানুষের কল্যাণে সাম্য আর সুবিচারের ভিত্তিপ্রস্তরে। লেখা হােক ‘জয় বাংলা', 'জয় স্বাধীন বাংলাদেশ। পাঠক চলুন আমরা অসাধারণ নেতা ও দেশপ্রেমিকদেরকে জানতে সচেষ্ট হই। তাদের জীবন আলােয় খুঁজে নেই স্বাধীনতার লক্ষ্য সাম্য ও সুবিচার পথের ঠিকানা। | আজকে এই বইটি প্রকাশ হতে পারল প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য’র প্রধান নির্বাহী আরিফুর রহমান নাইমের আন্তরিক উদ্যোগের কারণে। ক্যানাডা হতে আলবার্ট সুকুমার মণ্ডল ও ঐতিহ্য'র কম্পিউটার বিভাগের জহিরুল ইসলামও ধৈর্যের সাথে টাইপসেটিং করেছেন। বইয়ের জন্য চমৎকার প্রচ্ছদটি করেছেন সৈয়দ এনায়েত হােসেন। তাদেরকে অজস্র ধন্যবাদ।। কয়েক দশক ধরে লেখা এই বইটির বিভিন্ন রচনাবলি পড়ে সবচাইতে বেশি যিনি আমাকে অভিনন্দন জানাতে এবং উদাপনা যােগাতেন তিনি আমার মা। আমার বিশ্বাস তিনি ও বাবা অনন্তলােক হতে এখনাে তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। |